নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম মাসদাইরে ‘ছিনতাইকারী’ আখ্যা দিয়ে মো. সিজান (২৫) নামে এক যুবককে বৈদ্যুতিক খুঁটিতে বেঁধে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও মামলার প্রধান আসামি আল ফালাহ জামে মসজিদের ইমাম মুফতি কাউছার আহম্মেদ কাসেমীসহ অভিযুক্তদের কাউকেই এখনও গ্রেপ্তার করা যায়নি। এ ঘটনায় পুলিশ ও র্যাবের একাধিক দল অভিযান চালালেও তাদের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে আসামরিা গ্রপ্তোর না হওয়ায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করছেনে নহিতরে পরবিার ও এলাকার সচতেন নাগরকিরা। তারা বলছনে, উল্টো আসামদিরে নতেৃেত্ব শুক্রবার জুম্বার পর মছিলি করে হুঙ্কার দয়ো হচ্ছে মামলা তুলে নয়োর জন্য। মছিলিে কোমলমতি শশিু শক্ষর্িাথীদরে ব্যবহার করছেে আসামিরা।
এদিকে আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জে আবারও সামনে এসেছে ‘মব জাস্টিস’ বা গণবিচারের সংস্কৃতি। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা এবং ঘটনার পর বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিক ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্টরা।
বাসা থেকে ডেকে নিয়ে নির্যাতন
গত ৪ জুলাই রাত ১০টার দিকে পশ্চিম মাসদাইর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত সিজান ওই এলাকার ইউনুছ ওরফে ইন্নু মিয়ার ছেলে।
নিহতের বাবা ইউনুছ মিয়ার অভিযোগ, এলাকার একটি সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা সিজানকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে মাসদাইর মোড়ে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দীর্ঘ সময় ধরে বেধড়ক মারধর করে।
তার ভাষ্য, দুই পায়ে লোহার পাইপ দিয়ে আঘাত করা হয়। একপর্যায়ে সিজান অচেতন হয়ে পড়লে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে খানপুর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরিবারের আরও অভিযোগ, ‘আল ফালাহ কল্যাণ সংগঠন’-এর ৩০ থেকে ৪০ জন সদস্যের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে এ নির্যাতন চালানো হয়। পরিবারের সদস্যরা বারবার অনুরোধ করলেও তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়নি।
ইমামের বক্তব্য ও ভাইরাল ভিডিও
ঘটনার পর অভিযুক্ত ইমাম মুফতি কাউছার আহম্মেদ কাসেমী দাবি করেন, সিজানের বিরুদ্ধে এলাকায় ছিনতাইসহ বিভিন্ন অভিযোগ ছিল। তাকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখতে বোঝানোর উদ্দেশ্যে আনা হয়েছিল। পরে উত্তেজিত কিছু ব্যক্তি তাকে মারধর করলেও সেটি তার নির্দেশে হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
তবে ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। ভাইরাল ভিডিওতে কাউছারকে বলতে শোনা যায়, “যার কাছে যা আছে সব নিয়ে আমরা নেমে যাবো ইনশাআল্লাহ। আমাদের ঐক্য থাকলে প্রশাসন কিছু করতে পারবে না।” একই ভিডিওতে তিনি আরও বলেন, “মারছে কে? পাবলিক। পাবলিক কুত্তা মেরে ফেললে কোনো অন্যায় হবে? ইনশাআল্লাহ মামলা-হামলা কিচ্ছু হবে না।”
ভিডিওটির সত্যতা ও প্রেক্ষাপট নিয়ে তদন্ত চলছে।
২১ জনের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার নেই
সিজান হত্যার ঘটনায় ৬ জুলাই ফতুল্লা মডেল থানায় নিহতের মা শিল্পী বেগম একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ছয়জনের নাম উল্লেখসহ মোট ২১ জনকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাত আরও ১৪ থেকে ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে রয়েছেন মুফতি কাউছার আহম্মেদ কাসেমী, আব্দুল গনি, জিলানী ফকির, আজহার রাজমিস্ত্রি, সাইদুল ও আলম।
তবে মামলা দায়েরের কয়েকদিন পরও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহাবুব আলম জানয়িছেনে, মামলার পর থেকেই পুলিশ ও র্যাবের একাধিক দল গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালাচ্ছে। পাশাপাশি এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
তিনি দাবি করেন, আসামী গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, সিজান হত্যাকাণ্ডের আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই এবং যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে।
ঘটনার পর নতুন বিতর্ক
হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় আরও একটি বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, অভিযুক্তদের পক্ষে জনমত তৈরির উদ্দেশ্যে একটি মাদ্রাসার কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দিয়ে মিছিল করানো হয়েছে। তাদের দাবি, প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও শিশু শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামানো হয়।
তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো তদন্তের ফল প্রকাশ করা হয়নি।
মব জাস্টিস নিয়ে উদ্বেগ
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কোনো ব্যক্তি অপরাধে জড়িত থাকলেও তাকে শাস্তি দেওয়ার একমাত্র বৈধ উপায় হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া এবং আদালতের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করা। গণপিটুনি বা জনতার হাতে বিচার আইনের শাসনের পরিপন্থী।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এ ধরনের ঘটনা শুধু একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না, বরং বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই সিজান হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।
এদিকে প্রধান আসামিসহ অন্য অভিযুক্তরা এখনও গ্রেপ্তার না হওয়ায় নিহতের পরিবার ক্ষোভ ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—আইনের প্রতি আস্থা কমে যাওয়ায় সমাজে কি মব জাস্টিসের সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে, নাকি দ্রুত বিচার ও কার্যকর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এ ধরনের প্রবণতা রোধ করা সম্ভব হবে।
মব জাস্টিস বন্ধে দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি মাহবুবুর রহমান মাসুমের
নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেছেন, ফতুল্লার পশ্চিম মাসদাইরে ছিনতাইকারী আখ্যা দিয়ে এক যুবককে বাসা থেকে ধরে এনে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক ঘটনা। শনিবার (১১ জুলাই) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ টেলিভিশন জার্নাালিস্ট এসোসিয়েশনের অভিষেক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, “ছেলেটি যদি অপরাধী হয়েও থাকে, তাহলে তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া উচিত ছিল। কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে পিটিয়ে হত্যা করার সুযোগ নেই।”
তিনি আরও বলেন, “একজন মসজিদের ইমামের নেতৃত্বে এমন একটি ঘটনার অভিযোগ উঠেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। এ ঘটনায় জড়িতদের এখনও গ্রেপ্তার করা হয়নি। দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা না হলে সমাজে মব জাস্টিসের প্রবণতা আরও বাড়বে এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে।”
অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, “রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে অপরাধীদের বিচার আদালতেই হতে হবে। গণপিটুনি বা জনতার হাতে বিচার কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই সিজান হত্যা মামলার প্রকৃত অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই।”


































