একসময় ট্রাকের হেলপার হিসেবে কাজ করতেন। ফাঁকে ফাঁকে ছোটখাটো চুরির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ছিল। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ধীরে ধীরে মাদক সেবন ও চুরির কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এরপর সময়ের সঙ্গে বদলে যায় তার কর্মকাণ্ডের ধরন। ছোটখাটো চুরি থেকে শিল্পকারখানার মালামাল চুরি—আর সেখান থেকেই এলাকায় গড়ে ওঠে তার প্রভাববলয়।
তিনি সিদ্ধিরগঞ্জের আটি ওয়াপদা কলোনি তথা নাসিক ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বউবাজার এলাকার মৃত গিয়াস উদ্দিনের ছেলে সাহেব আলী। বর্তমানে স্থানীয়দের একটি অংশ তাকে ‘দুর্ধর্ষ ক্যাডার’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। তার বিরুদ্ধে মাদক, ছিনতাই, ডাকাতি, চুরি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ নানা অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
তবে স্থানীয়দের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সাহেব আলী একা কীভাবে এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠলেন? তার পেছনে কারা রয়েছেন? কারা তার অপকর্ম থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন এবং কারা তাকে নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছেন?
জুটমিলের মালামাল চুরির অভিযোগ
স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ, সাহেব আলীর অপরাধজীবনের বড় মোড় আসে মনোয়ারা জুটমিলের মালামাল চুরির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার পর। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে জুটমিলের বিভিন্ন মালামাল ও যন্ত্রাংশ চুরির সঙ্গে একটি চক্র সক্রিয় ছিল।
স্থানীয়দের দাবি, ওই চক্রের মাধ্যমে মনোয়ারা জুটমিলের কয়েক কোটি টাকা মূল্যের মেশিনারিজ ও অন্যান্য মালামাল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। চুরি করা মালামাল সরানো ও বিক্রির ক্ষেত্রে কয়েকজনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে হাবিবুর নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, সাহেব আলীর চুরি করা মালামাল আটকে রেখে কমিশন নেওয়া এবং পরে তা পরিবহনের ক্ষেত্রে হাবিবুরের ভূমিকা ছিল।
এমনকি চুরি করা মালামাল হাবিবুরের ট্রাক ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হতো—এমন অভিযোগও করেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা সংযোজন করা হবে।
‘ভাঙারি মিলন’-এর দোকানে চুরি করা মাল বিক্রির অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাহেব আলীর চুরি করা বিভিন্ন মালামালের একটি অংশ মিলন ওরফে ‘ভাঙারি মিলন’-এর দোকানে বিক্রি করা হতো।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, চোরাই মালামাল কেনাবেচার মাধ্যমে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে। সাহেব আলী চুরি করে মালামাল সংগ্রহ করতেন, আর সেই মাল নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিক্রি করে অর্থ ভাগাভাগি করা হতো—এমন অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, চোর যদি অপরাধ করে লাভবান হয়, আর সেই চোরাই মাল কেনাবেচায় কেউ লাভবান হয়, তাহলে অপরাধের পেছনের পুরো চক্রটিকেও শনাক্ত করা জরুরি।
আশ্রয়-প্রশ্রয়েই কি বেপরোয়া সাহেব আলী?
স্থানীয়দের অভিযোগ, একের পর এক কর্মকাণ্ডের পরও সাহেব আলী এলাকায় প্রকাশ্যে চলাফেরা করায় তার পেছনে প্রভাবশালী একটি মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে কি না—এ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, হাবিবুর ও মিলন ওরফে ভাঙারি মিলনের মতো ব্যক্তিদের সঙ্গে সাহেব আলীর যোগাযোগ ও স্বার্থের সম্পর্ক তাকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
তাদের অভিযোগ, সাহেব আলীর কর্মকাণ্ড থেকে কেউ কেউ আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা অপরাধীদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে সাহেব আলী নিজের প্রভাব বিস্তার করেছেন।
র্যাব-পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ
সাহেব আলীকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক তৈরি হয়েছে তার বিরুদ্ধে ওঠা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগ নিয়ে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, তার বিরুদ্ধে র্যাবের ওপর হামলা, পুলিশের গাড়িতে পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ এবং পুলিশের এক এএসআইকে আটক করে তার কাছ থেকে ওয়াকিটকি ছিনিয়ে নিয়ে মারধরের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা নিছক স্থানীয় অপরাধ নয়; বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মতো গুরুতর বিষয়।
একজন সাধারণ চোর থেকে কীভাবে একজন ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার মতো দুঃসাহস দেখানোর পর্যায়ে পৌঁছালেন—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে তার অপরাধী নেটওয়ার্ক ও আশ্রয়দাতাদেরও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
‘পুলিশ-র্যাব আমাকে ধরবে না’—এমন দম্ভের অভিযোগ
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, সাহেব আলী এলাকায় প্রকাশ্যে এমন দম্ভ করে বেড়ান যে পুলিশ কিংবা র্যাব তাকে ধরতে পারবে না।
তার পেছনে ‘কিনা আছে’—এমন কথাও তিনি বিভিন্ন সময় বলে বেড়ান বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
এ ধরনের বক্তব্য সত্য হলে প্রশ্ন উঠছে—কোন শক্তির ওপর ভর করে একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে উপেক্ষা করার সাহস পাচ্ছেন?
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো এলাকায় অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিলে সাহেব আলী কীভাবে আগেই খবর পেয়ে যান—এ নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজনের দাবি, মিলন ও হাবিবুরের মাধ্যমে কতিপয় পুলিশ সদস্য এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় বিপথগামী সদস্যকে নিয়মিত মাসোহারা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি সত্যিই কোনো অপরাধী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের খবর আগেই পেয়ে থাকে, তাহলে অভিযানের তথ্য ফাঁস হচ্ছে কোথা থেকে—এটি তদন্ত করে দেখা জরুরি।
মাদক, ছিনতাই ও ডাকাতির অভিযোগে আতঙ্ক
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে সাহেব আলীকে ঘিরে এলাকায় মাদক, ছিনতাই, ডাকাতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তার নাম উঠে এলেও তিনি প্রকাশ্যে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষায়, ‘সাহেব আলীকে শুধু ধরলেই হবে না; তার পেছনে যারা অর্থ, পরিবহন, চোরাই মাল বিক্রি এবং প্রভাবের জোগান দেয় তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।’
‘শেল্টারদাতাদের ধরলেই বের হবে পুরো নেটওয়ার্ক’
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সাহেব আলীর অপরাধের নেপথ্যে যদি কোনো সহযোগী, আশ্রয়দাতা, চোরাই মাল ক্রেতা বা অর্থদাতা থেকে থাকে, তাহলে তাদের শনাক্ত করা গেলে পুরো নেটওয়ার্কের চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
তাদের দাবি, সাহেব আলীর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে সেগুলো তদন্তের পাশাপাশি তার যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন, চোরাই মাল বিক্রির চ্যানেল, পরিবহন ব্যবস্থাপনা এবং অপরাধীদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়েও তদন্ত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অর্থ গ্রহণ বা তথ্য পাচারের অভিযোগ সত্য কি না, সেটিও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
পুলিশের বক্তব্য কী?
সাহেব আলীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ, তার সহযোগী ও কথিত আশ্রয়দাতাদের ভূমিকা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের তথ্য ফাঁসের অভিযোগ সম্পর্কে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ ও নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের বক্তব্য নেওয়া জরুরি।
অভিযোগের বিষয়ে সাহেব আলী, হাবিবুর ও মিলন ওরফে ভাঙারি মিলনের বক্তব্যও নেওয়া হবে। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
স্থানীয়দের দাবি, অপরাধী যত বড়ই হোক, তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয়, অর্থ বা সহযোগিতা দেওয়া ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। তাহলেই সাহেব আলীকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অভিযোগের প্রকৃত রহস্য উন্মোচন এবং আটি ওয়াপদা কলোনি ও বউবাজার এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।


































