কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী সৈকতের পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত একই পরিবারের তিন সদস্যের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়। বুধবার (২৮ অক্টোবর) বাদ জোহর ফতুল্লার পোস্ট অফিস সংলগ্ন শাহজাহান রোলিং মিলের পাশে বায়তুল নাজাত জামে মসজিদে তাঁদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে দাপা ইদ্রাকপুর কবরস্থানে তাঁদের দাফন করা হয়।
নিহতরা হলেন ফারিহা কবির (৩৩), তাঁর ছোট ভাই নাফিস তেহামি (২৬) এবং ফারিহার সাড়ে ছয় বছর বয়সী ছেলে ফাইজান নূর। একসঙ্গে পরিবারের তিন সদস্যকে হারিয়ে শোকস্তব্ধ স্বজনেরা।
নাফিস তেহামি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মাস্টার্স ইন চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার’ প্রোগ্রামের শিক্ষার্থী ছিলেন। ফারিহা স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গায় বসবাস করতেন। তাঁর ছেলে ফাইজান নূর চুয়াডাঙ্গার প্রদীপন মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠের কেজি-টু শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। ফারিহার স্বামী নূর আলম ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডে কর্মরত। তাঁদের বাবা জিহাদুল কবির একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা।
নিহত ফারিহার চাচাতো বোন সাদিয়া বিনতে হাবিব জানান, তাঁদের দাদা রেলওয়েতে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে ফারিহা ও নাফিসসহ পরিবারের সদস্যরা ফতুল্লা পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের পূর্ব পাশের রেলওয়ে কলোনিতে বসবাস করতেন। সেখানেই তাঁদের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে। ফতুল্লায় তাঁদের নিজস্ব বাড়িও রয়েছে।
সাদিয়া জানান, ২০১৯ সালে ফারিহার বিয়ে হয়। স্বামী ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করায় তাঁরা চুয়াডাঙ্গায় থাকতেন। চলতি মাসের ১৪ অক্টোবর ফারিহা ও তাঁর এক খালাতো বোনসহ পরিবারের ১০ সদস্য কক্সবাজারে বেড়াতে যান।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর সকাল ১০টার বাসে তাঁদের ঢাকায় ফেরার কথা ছিল। সকাল ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে বাস তাঁদের রিসোর্ট থেকে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। রিসোর্টের একটি কক্ষে তিনজন এবং অন্য একটি কক্ষে ছয়জন অবস্থান করছিলেন।
সাদিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রিসোর্টে আগুন লাগে। এ সময় তিনজন জানালার থাই গ্লাস ভেঙে বের হতে সক্ষম হন। সকাল পৌনে ৮টার দিকে তাঁর চাচা ফোন করে অগ্নিকাণ্ডের খবর জানান। পরে তাঁরা স্বজনদের মৃত্যুর সংবাদ পান।
তিনি আরও জানান, ফারিহার স্বামী জরুরি কাজে আগের রাতেই রিসোর্ট থেকে চলে আসায় প্রাণে বেঁচে যান।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিহতদের দাদা ও নানার বাড়ি নারায়ণগঞ্জে। পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দাদার কবরের পাশেই তাঁদের সমাহিত করা হয়েছে।
স্বজনেরা জানান, একসঙ্গে পরিবারের তিন সদস্যকে হারিয়ে তাঁরা শোকে পাথর হয়ে গেছেন। তাঁদের ভাষায়, এই দুর্ঘটনায় পরিবারের একটি প্রজন্ম যেন শেষ হয়ে গেল। বিশেষ করে মেধাবী তরুণ নাফিসকে ঘিরে পরিবারের অনেক স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছিল। এখন সেই স্বপ্ন শুধুই স্মৃতি।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতির অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে হয়তো এমন মর্মান্তিক পরিণতি এড়ানো সম্ভব হতো।
পরিবার সূত্রে আরও জানা গেছে, তাঁদের সঙ্গে কক্সবাজারে যাওয়া আরেক খালাতো বোন মেহজাবিনকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় এবং অন্য দুই খালাতো বোন ইসরাত জাহান ও লায়লা জাহান নাবিলাকে টাঙ্গাইলের নাগরপুরে দাফন করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত: গত ১৭ অক্টোবর কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী সৈকতের পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় প্রাণ হারান একই পরিবারের তিন সদস্য ফারিহা, তাঁর ভাই নাফিস ও ছেলে ফাইজান। তাঁদের ফতুল্লায় দাফনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো পরিবারের তিন সদস্যের শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা।


































