নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

শনিবার,

১৮ জুলাই ২০২৬

ফাঁকা মাঠে শো-ডাউন!

নারায়ণগঞ্জ টাইমস:

প্রকাশিত:২০:১৯, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

ফাঁকা মাঠে শো-ডাউন!

নারায়ণগঞ্জ নগরীতে ঘোষিত হকার উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে ভিন্নধর্মী এক পরিস্থিতি। প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে আগেই সরে যায় হকাররা, আর নির্ধারিত দিনে ফাঁকা মাঠে কর্মসূচি পালন করে আলোচনায় আসেন সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান।

জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রধান সড়ক ও ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করে আসছিলেন হকাররা। এতে করে পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন, যানজট এবং জনভোগান্তি চরম আকার ধারণ করে। বিষয়টি নিয়ে নগরবাসীর পক্ষ থেকে বহুবার অভিযোগ উঠলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব ছিল দৃশ্যমান। অবশেষে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হকার উচ্ছেদের ঘোষণা দেওয়া হয় এবং ১৩ এপ্রিল সোমবার দুপুরে অভিযান পরিচালনার দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হয়।

এই ঘোষণার পর থেকেই হকারদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর বার্তা দেওয়া হলে তারা বুঝতে পারেন, এবার আর আগের মতো পরিস্থিতি থাকবে না। ফলে ১২ এপ্রিল রাতেই শুরু হয় হকারদের সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া। গভীর রাত পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন সড়ক থেকে তারা নিজেদের দোকান, স্টল ও অস্থায়ী স্থাপনা সরিয়ে ফেলেন। কেউ কেউ নিজেরাই মালামাল গুছিয়ে নেন, আবার কেউ দ্রুত এলাকা ত্যাগ করেন।

পরদিন ১৩ এপ্রিল সকালে দেখা যায়, শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু সড়কসহ আশপাশের ফুটপাত সম্পূর্ণ হকারমুক্ত। দীর্ঘদিন পর ফুটপাত ফাঁকা থাকায় স্বস্তি ফিরে আসে পথচারীদের মাঝে। অনেকে অবাধে হাঁটাচলা করতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করেন। 

স্থানীয়দের ভাষায়, এমন দৃশ্য বহুদিন পর দেখা গেল।

তবে এই পরিস্থিতির মধ্যেই দুপুরে পূর্বঘোষিত সময় অনুযায়ী মাঠে নামেন সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান। তার সঙ্গে ছিলেন বিপুল সংখ্যক পরিছন্ন কর্মী ও সিটি কর্পোরেশনের অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী। কিন্তু বাস্তবে উচ্ছেদ করার মতো কোনো হকার বা অবৈধ স্থাপনা না থাকায় অভিযানটি কার্যত রূপ নেয় উপস্থিতি প্রদর্শনের কর্মসূচিতে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে পরিছন্ন কর্মীদের নিয়ে অবস্থান নেন প্রশাসক। কোথাও কোথাও তাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। পুরো বিষয়টি অনেকের কাছে শো-ডাউন হিসেবেই প্রতীয়মান হয়। স্থানীয়দের কেউ কেউ এটিকে ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করে মন্তব্য করেন, যেখানে প্রতিপক্ষই নেই, সেখানে শক্তি প্রদর্শনের তেমন কোনো তাৎপর্য থাকে না।

তবে প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, এটি কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং একটি বার্তা। তারা মনে করেন, প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থান দেখেই হকাররা আগেই সরে গেছে, যা এই কর্মসূচির একটি সফলতা। তাই মাঠে উপস্থিতি দেখিয়ে ভবিষ্যতের জন্যও কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে যাতে কেউ পুনরায় ফুটপাত দখল করার সাহস না পায়।

নগরবাসীর প্রতিক্রিয়া অবশ্য মিশ্র। একদল মানুষ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, শহরকে দখলমুক্ত রাখতে এমন কঠোর অবস্থান জরুরি ছিল। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে হকারদের কারণে শহরের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছিল, যা এখন কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

অন্যদিকে, আরেকটি অংশের মানুষ বিষয়টিকে কিছুটা নাটকীয় বলে মনে করছেন। তাদের ভাষায়, যেখানে উচ্ছেদের কিছুই ছিল না, সেখানে এত লোকবল নিয়ে শো-ডাউন করার প্রয়োজন কী? তারা মনে করেন, বাস্তব সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি প্রশাসনের উচিত টেকসই পরিকল্পনা নেওয়া।

এদিকে হকারদের মধ্যেও রয়েছে নানা প্রতিক্রিয়া। অনেকেই জানিয়েছেন, প্রশাসনের চাপের মুখে তারা সরে দাঁড়িয়েছেন। তবে তাদের বড় উদ্বেগ—জীবিকা। এক হকার বলেন, আমরা তো খেতে নামি। হঠাৎ করে সরিয়ে দিলে আমাদের বিকল্প কী? তারা পুনর্বাসনের দাবি জানান এবং নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার আহ্বান জানান।

এই ঘটনা নগর ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। তারা বলছেন, শুধু উচ্ছেদ নয়, এর সঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনা থাকা জরুরি। হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান, লাইসেন্সিং ব্যবস্থা এবং নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করা গেলে এই সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান করা সম্ভব।

তারা আরও বলেন, নগর ব্যবস্থাপনায় শক্তি প্রদর্শন সাময়িকভাবে কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, যেখানে প্রশাসন, হকার এবং সাধারণ জনগণ—সব পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া হবে।

এদিকে প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য না পাওয়া গেলেও সিটি কর্পোরেশনের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, এই ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। শহরকে দখলমুক্ত রাখতে তারা নিয়মিত নজরদারি চালাবে এবং প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে।

সব মিলিয়ে, নারায়ণগঞ্জে ঘোষিত হকার উচ্ছেদ অভিযান বাস্তবে কোনো উচ্ছেদ ছাড়াই শেষ হলেও এটি নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। একদিকে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের ফলে আগাম ফল পাওয়া গেছে, অন্যদিকে নির্ধারিত দিনে শো-ডাউন ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন।

এই ঘটনাকে কেউ দেখছেন সফলতা হিসেবে, আবার কেউ বলছেন এটি ছিল শুধুই প্রদর্শনী। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট নারায়ণগঞ্জের ফুটপাত এখন আপাতত হকারমুক্ত, আর ভবিষ্যতে এই অবস্থা ধরে রাখা যায় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।